in ,

ভ্রমন কাহিনিঃ স্বপ্নীল সফর-১ম পর্ব –মোহাম্মদ এহসান আলী

বড়গাছি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়

মহানন্দা টাইমস ডেস্কঃ
কাউকে যদি বলা হয় অমুক বিষয়টা আপনি দেখবেন না কি শুনবেন? স্বভাবতঃ তিনি সহাস্যে জবাব দেবেন “হ্যাঁ, দেখবো” । যদি বলা হয় স্ক্রিনে / রুপালী পর্দায় দেখবেন নাকি বাস্তবে সরেজমিনে দেখবেন? উনি স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দেবেন যে স্বয়ং সরেজমিনে গিয়েই দেখবেন। আর এটাই প্রায় প্রত্যেকের-ই প্রত্যাশা। যখন টিভির (TV)পর্দায়,ইউটিউব/Face book বা ইন্টারনেটে দেখতাম আমার রূপসী বাংলার রূপ-বৈচিত্র্য পূর্ন সৌন্দর্য্য সমূহ তখন সত্যি মন ছুটে যেতে চাইতো সেথায় অজান্তে,অবলীলায়—-। বিভিন্ন হিস্ট্রিক্যাল-হেরিটেজে,পর্যটন কেন্দ্রে কে না যেতে চায় বলুন! তবু যেতে চাইলেই তো আর হুট করে যাওয়া যায়না ,যাওয়া হয়েও ওঠেনা। মন খারাপ হয় মাঝে মধ্যেই এই ভেবে যে , আমি বিশাল কোন কোটিপতি বা শিল্প পতিও নই আর আমার আধ্যাত্নিক কোন শক্তি ও নেই ; আর আমি কোনও পাখিও নই যে মুক্ত বিহঙ্গের মতো উন্মুক্ত আকাশে ডানা মেলে উড়বো স্বেচ্ছায় স্বাধীন, মহান আল্লাহর অসীম-অশেষ অসংখ্য নেয়া’’মত দেখবো সারাক্ষণ-সারাদিন—। বিচিত্র রঙ্গে রঙ্গীন——-! মনে মনে ভাবতুম আহা!! স্বপ্ন যদি সত্যি হতো—-একবার যদি যেতে পারতাম আমার কল্পনার কক্সবাজারে,স্বপ্নের সেন্টমার্টিন দ্বীপে,নান্দনিক নারিকেল জিঞ্জিরায় —!! স্বপ্নে শতবার সাঁতরেছি সফেন সাগরের সল্টেড নীলজলে,কল্পনায় কতবার অবগাহন করেছি সী–বীচে; উত্তেজনায় উজ্জীবিত হয়েছি। জোয়ারে যৌবন প্রাপ্ত হয়েছি বারেবার। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে সত্যি সেই স্বর্ণালী সুদিন এসে গেলো সম্মুখে আমাদের[স্টাফের]সবার!আমার হাত প্রায় অর্থ শূন্য, সদ্য সাত-ই [০৭/০২/২০২০] ফেব্রুয়ারি-২০২০কোলকাতা থেকে ফিরেছি ট্রিট্মেন্ট সেরে। প্রায় হাফ লাখ রূপিজ হাতিয়ে নিয়েছে কাজল-কুমারী, মায়া-কন্যা কোলকাতা। কিন্তু সুবর্ণ- সুযোগও দ্বার প্রান্তে সমাগত! কি করি! কী করি? মানি ম্যানেজ করতে দারূন কষ্ট হলেও কাংখিত কৌতুহলের কাছে হার মানলাম,আবেগের উচ্ছ্বাসে। আনন্দে আর উল্লাসে। শেষ পর্যন্ত আবারও শুভ যাত্রা। স্বপ্নের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের উদ্দেশ্যে সম্মিলিত স্বপ্নীল সফর ——- ।
এই তো সেদিন গত ০৮ ই মার্চ ২০২০ইং রোজ রবিবার স্বপ্নীল সফরে বাস্তবেই বেরিয়ে পড়লাম“স্কুল পরিবার”। ৩৫ জনের বিশাল বহর, ট্রেনে চেপে বসলাম, রাজশাহী টু ঢাকা; ঢাকা টু চিটাগং এর উদ্দেশ্যে গন্তব্য কল্পনার কক্সবাজার। মুসাফির দলের বিশাল বহর নিয়ে ট্রেন জার্নিতে খুব সুবিধেই হচ্ছিলো সকলের। হেড স্যারের দারূন দূরদর্শিতায় ট্রেন-টিকেট গুলো সপ্তাহ খানেক আগে থেকেই বুকিং দেয়া ছিলো সুতরাং একই ক্যাবিনে / কামরায় ছিলাম আমরা সবাই। যার ফলে আনন্দ ভ্রমন ছিলো রসে টইটুম্বর। স্বপ্নীল সফর যেন সত্যি সফল হতে চলেছে। দীর্ঘক্ষণ সিটে বসে থাকার বিরক্তিবোধ ছিলোনা, ছিলোনা এক ঘেঁয়েমি; ছিলোনা নিরবতা-শূন্যতা। হাঁটা –হাঁটি, ওয়াশ রুমের এমনকি প্রার্থনার সুবর্ণ সুযোগ ছিলো সবার জন্য। সবাই ছিলাম এনার্জিতে ইউনাইটেড। ইমেজ ও উত্তেজনায় উজ্জীবিত। একে অপরকে হেল্প করছিলাম আমরা । সহায়তা করছিলাম সবাই সবাকে। শেয়ার করছিলাম সুখ-শান্তি আর সমস্যা গুলো নিমিষে-নির্দিধায়। আমাদের ইয়াং টিচারদের চমকপ্রদ নিউ আইডিয়া গুলোও মাঝে মধ্যেই বিমুগ্ধ করছিলো,বিনোদন দিচ্ছিল। সর্ব স্যার মাহমুদ সুলতান,জাহাঙ্গীর, আব্দুল্লাহ আল বাকীর বেস্ট প্ল্যানিং সহায়তা দিয়েছে সার্বক্ষণিক। দিন-রাত ট্রেন চলার পর আমাদের বিশাল বহরকে সকাল বেলা স্বাগত জানালো চঞ্চল চট্টগ্রাম। সকাল ৯টা নাগাদ নাস্তা সেরে “আনোয়ার“ ভাইয়ের মাধ্যমে কক্সবাজারে যাওয়ার জন্য রিজার্ভ করলাম হানিফ এন্টার প্রাইজ। চট্টগ্রামের হোটেল তাজমহলের সামনের এক” টি” স্টলের গরম মসলা ও কাঁচা পুদিনা পাতা মিশ্রিত চায়ের স্বাদ যেন আজ ও মনে আছে। চা চক্র সেরে সকাল সাড়ে ৯ টায় চললাম কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। ফিরিঙ্গী বাজার,পটিয়া ,পাথরঘাটা পার হচ্ছি ; কর্নফুলির শত শত সাম্পান স্বাগত স্যালিউট জানালো যেন আমাদের ঢেউয়ের তালে তালে। সাঙ্গু, সাতকানিয়াকে সাঁ সাঁ করে পেছনে ফেলে

সামনে এগুচ্ছি তো এগুচ্ছি–। অসংখ্য মাজার,বাজার,হাট-ঘাট; সুদর্শনীয় স্থান,ঘন সবুজ বন-বনানী পাহাড়, টিলা, টাওয়ার, সেগুন,মেহগনী,বেতের সারি সারি বাগান আরো কতো সুপারি সারি ;মসজিদ,মন্দির প্রতিষ্ঠান পেরিয়ে লোহাগড়া চকোরিয়া ,ডুলাহাজরা, রামুর মধ্য দিয়ে ঢূঁকে পড়লাম ডলফিনমোড়;কলাতলী; কক্সবাজারে। ততক্ষণে তীব্র দূপুরের দূর্দন্ড রৌদ্র প্রতাপে দেহটা দারূন দূর্বল পুরো টিম-ই সো টায়ার্ড। বেলা প্রায় আড়াইটার দিকে হোটেল লেমিস রিসোর্টে(Lemis & Resort) ব্যাগ এ্যান্ড ব্যাগেজ রেখে মাসুদ স্যারের সঙ্গে কক্সবাজারের লাবণী সী বীচের সল্টেড সফেন সৈকতে নেমে পড়লাম স্বপ্নীল সাঁতারে। সেকেন্ডে সেকেন্ডে শুভ্র সফেন শত-সহস্র ঢেউ আছড়ে পড়ছে বালিময় বর্ণিল বেলা ভূমিতে। প্রকৃতি পিপাসু মন মেতে উঠেছিলো লোনা জলের যৌবন জোয়ারে। সাগরের সল্টেড শক্তিশালী সফেন ঢেউগুলো স্বাগত সেলাম করলো যেন আমাদের। কৃতজ্ঞতায় বিনীত চিত্তে মুখ থেকে বেরিয়েছে বহুবার “আল হামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন—“।
সাগর জলে নিমিষে ধুয়ে গেলো সমস্ত কর্ম-ক্লান্তি,জার্নি-জ্বালার যন্ত্রনা । ময়লা- মলিনতা ম্লান হয়ে গেলো যেন মিনিটে। লাবনী সী –বীচে “অমিত-লাবণ্যের” মিলন মেলাও দেখেছি। Feel করেছি ফটোগ্রাফি ফ্যাশন “অপূর্ব” ভঙ্গিতে। অতঃপর ফ্রেশ মাইন্ডে চাঙ্গা দেহে দু-মুঠো ভাত খেয়ে “গা”এলিয়ে দিলাম ফোমের ফানি বিছানায়–। স্নেহের জাহাঙ্গীর স্যারের সঙ্গে ৯ মার্চ রাত ৯টায় রিজার্ভ অটোতে বেরিয়ে পড়লাম চাঁদনী রাতের রঙ্গীন শহরের সৌন্দর্য্য শোষনের শর্তে। বার্মিজ-বাজার,শুটকি বাজার; সুগন্ধা সী বীচ, ইউনানী বীচ, মেরীন ড্রাইভ, পথের ধারে অট্টালিকা সম সুউচ্চ পাহাড় , টিলা, পাহাড়ি কটেজ (Cottage)দেখেছি দু চোখ ভরে। হিমছড়ি গিয়েছি ঝর্নায় ভিজেছি, ঝর্নার সুপেয় পানি প্রাণ ভরে পান করেছি, পানি নিয়েছি স্পট কর্মী ইউনুস মামার মাধ্যমে। আহ! কী সেই শান্তি!! কী সেই ঝর্না–। কী অপরূপ অপুর্ব নেয়ামত ; সুবহানাল্লাহ ! আবেগে আনন্দে বারংবার পড়েছি, আল হামদু লিল্লাহ—। এরপর রাতে রইলাম লেমিস রিসোর্টে। অতঃপর পরদিন ১০ মার্চ২০২০ সকাল সাড়ে ৫টায় আবার ও সফর শুরু—। টার্গেট টানা টেকনাফ, সাগর কন্যা সেন্ট মার্টিন দ্বীপ / নান্দনিক নারিকেল জিঞ্জিরা। ফজর পড়ে চেপে বসলাম “কেয়া এন্টারপ্রাইজের সুপার সার্ভিসে । সুবহে সাদেকের শুভ ক্ষণে সোঁ সোঁ শব্দে পেরোচ্ছিলাম শতাধিক বন-বনানী, টিলা,পাহাড়,পর্বত প্রভৃতী । প্রত্যুষে পার হচ্ছিলাম উখিয়া ,কুতুপালং বাজার, পালংখালি, , খাইংখালি, বালুখালি প্রভৃতী পেরিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশ্ব দিয়ে অসংখ্য পাহাড় টিলা আর লবণ চাষীদের লবণ ঢিবি দেখতে দেখতে মধুমতি সল্ট লিঃ বৌদ্ধ উপাসনালয়, হ্নীলা,টেকনাফ বিজিবি চেক পয়েন্ট পেরিয়ে ঢুকলাম দমদমিয়া পুলিশ ফাঁড়ির পাশ্বে। সকাল সোয়া ৮ টায় আমরা পৌঁছলাম শেষ বাস স্টপেজে———-।
আমাদের জন্য “জাহাজ আটলান্টিকের সমস্ত টিকেট রেডি। দম দমিয়ায় রুটি/পরাটার নাস্তা সেরে পৌনে নয় থেকে ৯ টায় উঠে পড়লাম “আটলান্টিক নামক পানি জাহাজে। নাফ-নদীর বিশাল বক্ষে ভাসছে অনেক জলযান। নৌযান, ট্রলারে তগঘী বা ফিশিং নেটে ফাতাহ দিচ্ছে জেলেরা, ধীবররা। স্পীড বোর্ড,কোস্ট গার্ড দূরে দাঁড়িয়ে । ঝিম ধরা নাফ নাদীতেও নর্মালি নীলাভ ঢেউ যেন সহস্র বার সেজদা দিচ্ছে সৃষ্টি কর্তাকে । শত কোটি বার সালাম দিচ্ছে শ্রেষ্ঠ রাসুল মুহাম্মদ(স)কে। অনেকের মতো আমরাও চরম উত্তেজনায় উপভোগ করছি নীল জলরাশির জম্পেশ যৌবন, ব্লু-ইকোনমির (Blue Economy) বিভিন্ন উপকরণ। ইঞ্জয় করছি বিউটিফুল(White sea Gull) সাদা সী গালের ইন্টারেস্টিং ক্রসিং ফিল্ডিং—।
সামুদ্রিক সাদা গাংচিলের এই নান্দনিক নয়ন জুড়ানো হৃদয়গ্রাহী উড়াউড়ি,পায়চারি,ভোজন বিহার কত যে আনন্দের ; কত যে মজার “ কত যে ওয়ান্ডারফুল ,সুবহানাল্লাহ!——-। একের পর এক জাহাজ গুলি স্ব-স্ব-গতিতে অটল সায়রের জলধীর সমস্ত জলতরঙ্গ চিরে চিরে তীব্র গতিতে অগ্রসর হতে লাগল স্বপ্নের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দিকে। যেতে যেতে ডানে দেখেছি বিশাল বিশাল সবুজে ঢাঁকা পাহাড় ;ঘন অরন্য, বন-বনানী। সাগর-পাহাড়ের গভীর মিতালি মিশে গেছে যেন মিলন মেলায়। বামে আবছায়া দেখেছি বার্মা / মায়ানমার / আরাকান সীমান্ত —–।
ঢেউয়ের পর ঢেউ পেরিয়ে উত্তাল উর্মিমালায় মিশলাম গিয়ে গহীন সাগরে । যে দিকে দৃষ্টি যায় শুধু পানি আর পানি ,জল আর জল। তবু পানীয় জলের বড্ড অভাব । সব সল্টেড ওয়াটার। কী বৈচিত্র্য !! প্রচন্ড লবণাক্ত পানিতেও সুস্থ্য সবল জীব,অণুজীব জীবন্ত। চলাচল করছে অসংখ্য প্রাণবন্ত প্রাণ, অসংখ্য অদেখা জীবন। সাগর বক্ষে সঞ্চিত রয়েছে সমস্ত সম্পদ —। সাড়ে তিন / ৪ ঘন্টা চলার পর ৩টে নাগাদ পৌছলাম স্বপ্নের সেন্ট মার্টিন দ্বীপে । রিয়াদ গেস্ট হাউসের (Riad Guest House) হোষ্ট হয়ে সাড়ে ৩ টার দিকে সদলবলে বেলা ভূমিতে অগ্রসর হলাম। প্যাকেজ পিকচার শেয়ার করলাম সবে। ঝপাৎ ঝপাৎ ঝাঁপিয়ে পড়লাম সেন্ট মার্টিন (উত্তর) সী বীচে। সৈকতের শুভ্র সল্টেড জলে জোয়ারের যৌবন বারেবার আঘাত হানছে ক্ষিপ্রতার সাথে। ক্ষরস্রোতা ঢেউ খাম খেয়ালি করছে ক্ষণে প্রতিক্ষণে। আমরা ৩/৪ জন জুটি বাঁধলাম, বীচের বেশ খানিকটা নিচে নেমে গেলাম,। ঢেউ আরো উত্তাল হলে পশ্চাতে ফিরলাম। জেলি ফিশের জ্বালায় সাড়ে চার বার চুলকালাম শংকিত শরীর । উহ! কী যে চুলকোনী । চুলকোতে চুলকোতে চললাম “রিয়াদ গেস্ট হাউসে”। লাঞ্চ সেরে লম্বা ঘুমের সুযোগ হয়নি। ছোট্ট মণিরা গেস্ট হাউসের দোলনায় দোল খাচ্ছিলো আর হৈ চৈ করছিলো। বাধ্য হয়ে বক্র বালিশ বুকে বিছানায় বারবার ব্যথ চেষ্টা করছিলাম ঘুমানোর। বিকেল ৫টায় শুরু হবে প্যাকেজ প্রোগাম। তাই সেন্ট মার্টিন দ্বীপ জামে মস্কে আমরা কয়েকজন আসর পড়েই নেমে গেলাম আনন্দ অভিযানে। প্রবাল দ্বীপ,পশ্চিম দ্বীপ; প্রায় সবখানে সকলে শেয়ার করলাম শান্তিময় পড়ন্ত বিকেল। পশ্চিম দ্বীপে “সান সেট ” / সাগরে সুর্যাস্ত ইঞ্জয় করে সামনে আরেকটু এগিয়ে ড. হুমায়ূন আহমেদের “সমূদ্র বিলাসের কাছে আমি আর হেড স্যার মাগরিবের স্বালাত সেরে নিলাম। জম্পেশ জার্নি চলছিলো আমাদের। সমূদ্র বিলাসের সামনের স্টল গুলো থেকে কেউ ডাব, কেউ বা সফট ড্রিংক্স ,কেউ বা বিস্কুট-রেডিমেড ফ্লাক্সের চা ইত্যাদি খেয়ে পিয়ে ফিরলাম রিয়াদ গেস্ট হাউসে। ডিনার-সাপার সেরে ঘুমের রাজ্যে বিভোর হয়তো কেউ কেউ। “এশার”পর একত্র হলাম ৭/৮ জন। ১০মার্চ ২০২০ রাত সাড়ে ৮ টার দিকে চললাম মেমবীচের দিকে/দারূচিনি দ্বীপের দিকে । রাত ৯ টা নাগাদ অধীর আগ্রহে দারূচিনি দ্বীপে বসে রইলাম মাত্র কয়েক জন। সেখানের এক টেম্পোরারি টি স্টলের কয়েকটি প্লাস্টিক চেয়ার নিয়ে আড্ডায় আত্নহারা জন কয়েক। দারূচিনি দ্বীপে চিনি ছিল কিনা অন্বেষণের অবকাশ পাইনি ততক্ষণে জোয়ারের শুভ্র ফেনায় জানু পর্যন্ত লবণাক্ত জলে জিম্মি। পায়ের তলায় চিনির মতো মোটা মোটা সিক্ত বালিকণা কিচ কিচ করছিলো এটা বেশ মনে আছে। ভেজা ট্রাউজারে টের পাচ্ছিলাম ক্ষণিক ক্ষণ ; জোয়ার কি ? এবং কাকে বলে? একটুও বিরক্তি বোধ করিনি বরং কবিতা লিখতে চেয়েছি —–
“তোমাতে এসেছি বলে এভাবে ভেজালে !
পদ যুগল ধুয়ে দিলে অভিসারে নীল-জলে!
বিরক্ত হইনি আমি তোমার রসিকতায়;
যে নেশায় এসেছিলাম পেয়ে গেছি তায়–।
জোয়ার-ভাটায় মগ্ন থেকো প্রকৃতির খেলায়;
অভিসার অনেক হলো বন্ধু এখন বিদায়—-।
মূহুর্তে আরো তীব্রতর হলো “সফেন সাগরের গর্জন আর গোয়ার্তুমি । গুরু গম্ভীরও গুম হয়ে রইল যেন আমার কবি-মন,বেশ কিছুক্ষণ।“ লা ইং শাকারতুম লা আজি দান্নাকুম ওয়ালা ইং কাফারতুম ইন্না আজাবি লা শাদীদ।[সুরা ইবরাহিমঃ০৭]আল কুরআনের এই আয়াতটি স্মরন হলো। পড়লাম সুবহানাল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহু আকবার!!—।
এর পরে আবারও এ্যানালগ টর্চ লাইটার দিয়ে দেখছিলাম উত্তাল ওসানের উন্মাদ উত্তেজনা। কী ভয়ংকর ভয়াল রূপ; কী সেই তর্জন-গর্জন। গোস্বায় গোঁগাচ্ছে যেন গোটা গগন। ফেনিল ফোস্কায় ফুলছে যেন কাল্পনিক দুধের কড়াই ; তীব্র দহনে যেমন দুধ উথলায় , এমন টা ভাবলেও কিছু্টা বুঝা যায় তবুও এই উপমা দেওয়া মোটেই ঠিক নয় কারন সাগর তো আর দুধের কড়াই বা প্যান / ডিশ নয়। চাঁদনী রাত সত্বেও টর্চের আলোতে ভালো করে দেখছিলাম নীল সাগরের অপরূপ; অবলীলা —–। চাঁদের আলোয় রাজ জোটক হয়ে থাকার চেয়ে চম্পট দিলাম আবসিক হোটেলের সজ্জিত শয্যায়। চাঁদের টানে জোয়ার –ভাটার টানা-টানি চলতেই থাকলো স্বপ্নপুরী সাগরে। আমি গা–গতর মেলে দিলাম ঘুমে। নিদ্রায় নিমগ্ন ছিলেম বহু ক্ষণ বর্নিল বিছানায় । বেশ ভালোই ঘুম হয়েছে অবশিষ্ট রাত। মুয়াজ্জিনের আজানে ঘুম ভাঙ্গেনি । কানে আসলো শ্রদ্ধেয় (ইসমাইল) স্যারের ডাক। হাই তুলে টলতে টলতে টয়লেটে গেলাম ।এরপর ওজু সেরে নামাজ সমাপ্ত করলাম কয়েকজন। ফজর পরেই নেমে পড়লাম সী-বীচে সূর্যোদয় দেখতে। দারূন দেখলাম সাগরের সূর্যোদয়। সী বীচে সাত সকালে সাইকেল চালালাম তিন স্যারে । এর পর সেন্টমার্টিন সীমান্ত পুলিশ ফাঁড়ির নীচে বাঁধের পাশ্বেই মরে পড়ে ছিলো বড়-সড় এক ডলফিন। সক্কাল বেলায় আমি আর শ্রদ্ধেয় ইসমাইল স্যার দুজনে মৃত ডলফিনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম অনেক ক্ষণ অদ্ভুত দৃষ্টিতে । সম্ভত জোয়ারে এসে আঁটকে গেছিলো। ১১মার্চ সাড়ে৮টায় নাস্তা সেরে সকাল সাড়ে ৯ টায় ট্রলারে চাপলাম ছেঁড়া দ্বীপ দর্শনে । সেখানে হোটেল-মোটেল নেই বিধায় তিনটে তন্দুর,আপেল,পেয়ারা ও পানির

পট এবং কয়েকটা বিস্কুটের প্যাকেট নিলাম শপিং ব্যাগে আমার সোনামণিদের জন্য। সেফটি জ্যাকেট পরে ট্রলারে অটল সাগরে সাগ্রহে সাবধানে বসে রইলাম বাচ্চাদের নিয়ে। ওয়াটার ফোবিয়াকে তুচ্ছ করে কয়েকজন ম্যামও উঠে বসলেন নৌযানে। তরতর বেগে সাঁতরে চললো সারেং এর তরনী। কয়েক ঘন্টা সাংঘাতিক গতিতে ট্রলার চলার পর আমরা পৌছলাম ছবির মতোই সুন্দর ছেড়া দ্বীপে। নূড়ি পাথর, প্রবাল পাথর, কেয়া ফল আর কেয়া বনের পাশ্বে পাথরে বসে রইলাম বহু ক্ষণ। নীল কুটিরের সমান ঘন ঘন আর বিশাল বিশাল ঢেউ ছলাৎ ছলাৎ ছোবল মারছে যেন দিল- দরিয়ার দুকুলে। মহান আল্লাহর অসীম রহমতে আসমান-জমিনের মাঝের অশেষ নেয়া’মতের কিঞ্চিত দেখেছি। সুনীল আকাশ ও নীল সলীলের সমঝোতা দেখেছি। পাহাড়-পর্বতের পবিত্র প্রত্যাশা পর্যবেক্ষণ করেছি। সাগর ও শঙ্খ চিলের চমৎকার- চিত্তাকর্ষক সখ্যতা পরোক্ষ করেছি।বন-বনীর বলিষ্ঠ বন্ধুত্ব আর বদান্যতা বিনয়ে বুঝেছি। জোয়ারের জম্পেশ যৌবন আর ভাটার ভীষন-ভয়াল টানও মর্মে মর্মে টের পেয়েছি । ছেঁড়া দ্বীপের কেয়াবন, কেয়ার –কাঁটা, নূড়ি পাথর আর ঢাউস ঢেউয়ের সফেন মিতালিতে মুগ্ধ হয়েছি। ভব দরিয়ায় সত্যি সত্যি ডুবে গেছিলুম সম্পূর্ন আবেগে। সে দিনের ঐ বাস্তব নীল সাগরের অবিরাম উর্মিমালায় অনুভব করছিলুম অনেক কিছুই । অকস্মাৎ নযরে পড়লো বড় বড় ডাব , কলা ও তরমুজ নিয়ে বসে আছেন কয়েকজন । ক্ষিপ্র দূপুর বেলায় তরমুজ ,বিস্কুট ও পটের পানি পিয়ে আবার উঠে বসলাম টলমল ট্রলারে। অভিজ্ঞতায় টইটুম্বর হয়ে যেন ফিরে এলাম নান্দনিক নারিকেল জিঞ্জিরায়।লাঞ্চ সেরে আবার গিয়ে আড়াইটায় উঠে বসলাম আটলান্টিকের সুবিশাল বুকে। সাগর পরী সেণ্ট মার্টিন দ্বীপ থেকে ফেরার পালা। বেলা ৩ টের দিকে ছাড়লো আমাদের জাহাজ। সারেং কোন সাঙ্ঘাতিক মিস করেছিলো কিনা সঠিক জানিনা তবে প্রায় ঘন্টা খানেক জাহাজ চলার পর ঘন্টা দেড়েক আমরা আঁটকে রইলাম সলীল সাগরের লোনা জলে। হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম বিরক্তি কি? কাকে বলে? কত প্রকার ও কি? কি? জোয়ার না এলে নাকি যাবেনা জাহাজ ! সকল শীপ সামনে এগিয়ে গেলো আটলান্টিক রইলো এক্কেবারে সক্কলের পেছনে। যাকগে ! সবার শেষে ভিড়লো জাহাজ তখন সন্ধ্যে সাড়ে সাত টা প্রায়। জাহাজ থেকে নেমে আবার উঠলাম “কেয়া এন্টার প্রাইজের বিশাল লাক্সারি বাসে।রাস্তায় শুরু হলো জটিল জ্যাম। দমদমিয়ার কোটবাজারের পাশ্বে জলসা জমলো কিছু ক্ষণ। রাত প্রায় দেড়টার দিকে কোন হালে হাজির হলাম কোলাহল মুক্ত কক্সবাজার,কলাতলীতে। পেটের ভেতর পাঁয়তারা করছে উদ্ভট কিছু শব্দ। সাড়ে তিন হাতের বিষণ্ণ বডিটা বড্ড বেসামাল ক্ষুধায় ।মৌন মিছিল চলছে যেন ব্যস্ত বেলিটায় বিরতি হীন। চট করে “লেমিস রিসোর্টের ৩০৭তে ব্যাগ ট্যাগ রেখে মধ্যরাতে বসলাম গিয়ে হোটেল সাদিয়ায়। বড্ড স্বাদে শান্তি করে দু মুঠো ভাত খেলাম সামুদ্রিক মাছ দিয়ে। যাক বাবা স্বস্তি পেলেম! পেট শান্তি তো জগত শান্তি। চাঁদের কিরন আর শুটকির সুঘ্রাণ শুঁকতে শুঁকতে শুয়ে পড়লাম বেডে। বপুটা বিছায়ে দিলাম দারূন আয়েশে অনুরাগে। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে আবার ফজর নামাজটা আদায় করে নিলাম। ফাঁক পেলেই প্রার্থনা গুলো শীঘ্র সেরে নিচ্ছিলাম । আমি ছিলাম কার্ডেড প্যাসেন্ট । তাই সপরিবারে ছিলাম সফরে । সে জন্য আমার ব্যাগে সব সময় রেডি ছিলো ফ্যামিলি প্যাক ডায়্যাসল্ট বিস্কুটের প্যাকেট ইত্যাদি। ডাব,সফট ড্রিংক্স, জাংক ফুড ,ডেবল ফুড , আইস ফুড, হট ফুড, ফাস্ট ফুড, স্ট্রীট ফুড এগুলি বিশেষ ভাবে আমার জন্য নিষিদ্ধ ছিলো। তাই অগত্যায় বাধ্য হয়েই (প্রাথমিক ঔষধের) ফার্স্ট এইড বক্স, চিড়া ,মুড়ি, আপেল,আমরুদ/সামার আপেল পেয়ারা। মাঝে সাঝে এনার্জি বৃদ্ধির জন্য জিরা পানি, ডাবের পানি, আইসক্রীম, কখনও বা ওর স্যালাইনের পানি এবং পাউরুটি-কলা কিনে দিয়েছি ওদের। আমি অবশ্য আপেল,পেয়ারাই বেশি খেয়েছি। ডক্টরের ডিরেকশন মতোই উনিশ-কুড়ি চলার প্রাণ পন প্রচেষ্টা করেছি । সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ৭০/=টাকা কেজি করে সুপার ফুড টমেটোর সালাদ করে খেয়েছি বাধ্য হয়ে। কেননা সুস্থ্যতার সঙ্গে সফরটা সমাপ্ত করতেই হবে। আলহামদুলিল্লাহ। স্বপ্নীল সফরে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে শুধু তোহমিনা ম্যামের হাল্কা ডিহাইড্রেশন ছাড়া আমার ও আমাদের কাউরো কোন সমস্যা হয়নি।১২মার্চ২০২০সকাল ৮টার দিকে হেডস্যারের সঙ্গে কয়েকজন গেলাম গাড়ি রিজার্ভ করতে কাকতালীয় ভাবে আবারো পেয়ে গেলাম হানিফ এন্টার প্রাইজের ঝাঁ চকচকে একটি বিলাস বহুল বাস। কক্সবাজারের ডলফিন মোড়ে সবাই উঠে বসলাম বাসের সীটে। সবাই সবাইকে দেখে নিলাম অন্ততঃ সাড়ে সাতবার।
হ্যাঁ, আমরা সকলেই আছি , বললেন হেড স্যার । অন্তরে অতৃপ্তি রেখেই মনে মনে বিদায়ী সেলাম ও স্যালিউট জানালাম কল্পনার কক্সবাজারকে। বাসের সীটে বসে যে যার মতো বিনোদনে ব্যস্ত হয়ে গেলো। কেউ খেতে লাগলো কলা,কোকোলা, আইস্ক্রীম আবার কেউ বা গল্প জুড়েছে জমজমাট গল্প। আবার কেউবা ফেসবুক কেউ বা পিক নিতে ব্যতি-ব্যস্ত—- । ইসমাইল স্যারের মুখে ছিলো মৃদু মিষ্টি হাসি । সাদিকুল স্যারের মুখে ও মাঝে মধ্যে সাউন্ড হচ্ছিলো সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ——–। আমি খুব আরামে বসে ভ্রমন কাহিনীর কংকালে বাস্তব –কল্পনার কাজল দিয়ে কারুকার্য করছিলাম নীরবে ; অলংকরণ করছিলাম অণুমনে,অণুক্ষণে ,। স্টার্ট হলো হানিফ এন্টার প্রাইজ। পথ পাড়ি দিতে লাগলো পর্যায়ক্রমে। পশ্চাতে পড়ে রইলো স্মৃতিময় সাইট গুলো। শুরু হলো শুভ যাত্রা ২য় পর্বের। গন্তব্য গহীন অরন্য,পাহাড় টিলা আর আদিবাসীদের আবাস ;শান্তি ,সৌহার্দ আর সম্প্রতীর শহর, অন্যতম পাহাড়ি এলাকা বর্নিল,বৈচিত্র ময় বান্দরবান। ক্রমশঃই কমে আসছে পথের দূরুত্ব, ঠিক যেমন জীবনের হায়াত—-। বাসে বেজে চলেছে বিভিন্ন ধাঁচের গান । জীবন গাড়িটা চলছে তো চলছেই । ভাবুক ভাবছে তো ভাবছেই। ভাবলাম আচ্ছা ; বাসে এ বিখ্যাত গানটা বাজালে কেমন হতো—-
“এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বলতো ————-।

What do you think?

Shahin Alam

Written by Shahin Alam

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

মুজিব শতবর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহবান তিনটি করে গাছ লাগান

স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদ উদযাপনের আহবান– গোলাম কবির